উপকূলে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছিল। মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ
খুলনা প্রতিনিধি
‘সিডরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়িসহ সহায়-সম্পদ সব তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ভাসিয়ে নিয়েছিল বাবাকে। পরে লাশ পাওয়া যায়। ভাইয়ের ছেলেও সিডরের আঘাতে মারা যায়। ১৭ বছর ধরে সংগ্রাম করে চলছি। কিন্তু আগের সেই অবস্থা এখনও ফেরাতে পারিনি। ভেঙে যাওয়া ঘরের মতো ঘর আর বানাতে পারিনি। সিডরের সময়ের চেয়ে এখনের ঘরটি আরও খারাপ অবস্থা। যাদের হারিয়েছি তাদের তো ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই। এই ১৫ নভেম্বর এলে বাবার জন্য হাহাকার বেড়ে যায়। ১৭ বছরের মধ্যে কত জনপ্রতিনিধি এলো। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার জাকির হোসেন এভাবেই তুলে ধরেন তার ক্ষত-বিক্ষত অবস্থার কথা। তিনি বলেন, এলাকার মানুষের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি হয়ে নিজে একটু ভালো থাকতে পারলেও সিডরের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সাউথখালীর ক্ষতিগ্রস্ত অন্যদের অবস্থা আরও শোচনীয়। বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু নদী শাসন যথাযথ না হওয়ায় সংকট রয়েই গেছে। তিনি জানান, তার মতো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আছে যারা সব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক পরিবার এখনও ঘর-বাড়ি তৈরি করতে পারেনি। আকাশে ঘন মেঘ দেখলে এখনও আঁতকে ওঠেন সাউথখালীর মানুষ।
সিডরের গ্রাসে বাবা-মাসহ পরিবারের ৭ সদস্যকে হারিয়েছিলেন সাউথখালীর বাসিন্দা মো. আল আমিন। সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর ১৭ বছরেও তিনি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। বলেশ্বর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছিল তার বসত বাড়িটিও। আল আমিন বলেন, সিডরের জলোচ্ছ্বাসে সেদিন বাবা, মা, নানী, বোনের মেয়ে, ফুপু এবং দুই ফুপাতো বোনকে হারিয়েছি। সিডরের পর বলেশ্বর নদীর ভাঙনে আমার বাড়ি-ঘর সব চলে গেছে। সিডরের ১৭টি বছর পার হয়েছে, তবুও কষ্ট লাঘব হয়নি। আতঙ্কে থাকি সবসময়।
উপকূলে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছিল। মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ। কিছু বুঝতে পারার আগেই জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়েছিল বাড়ি-ঘর, ফসলের ক্ষেতসহ পথচারীদের। এই ঘূর্ণিঝড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী এলাকা। এ গ্রামের প্রত্যকটি ঘর বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ৭৭৮ জন লোক মারা যায়।
সাউথখালীর হেমায়েত হাওলাদার বলেন, সিডরে সব হারিয়েছি। পরবর্তীতে বলেশ্বর নদীর কয়েক দফা ভাঙনে আরও নিঃস্ব হয়েছি। নদী ভাঙনে এখন জমি-জমা হারানোর শঙ্কা রয়েছে। ভাঙনের ফলে সাউথখালীর অনেকেই ভূমিহীন হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। যারা এখানে আছেন খুবই কষ্টে দিনযাপন করছেন।
সাউথখালীর মোস্তফা মোল্লা বলেন, তার পরিবারের ৮ জন লোক সিডরের আঘাতে মারা যায়। তিনি এখন ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে ৮ জনকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পারেননি আগের মতো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। কোনোমতে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন। স্বচ্ছলতায় আর ফিরতে পারবেন কি না জানেন না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ পোল্ডারের শরণখোলা-মোরেলগঞ্জে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি-১) মাধ্যমে ৬২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। চীনা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি এ বাঁধের কাজ শুরু করে। বাঁধের কাজ শতভাগ শেষ হলেও বলেশ্বর নদীর অব্যাহত ভাঙনের কবলে বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে বলেশ্বর নদীর তীরে সাউথখালী ইউনিয়নের গাবতলা আশার আলো মসজিদ এর সামনে থেকে ডিএস-৭ স্লইচ গেট পর্যন্ত ২০০ ফুটের বেশি রিং বাঁধ এবং মূল বাঁধের নিচে বেশকিছু সিসি ব্লক নদীগর্ভে বিলিন হয়। একই সঙ্গে বাঁধের বাইরে থাকা অন্তত ১০ একর কৃষি জমি ভেঙে যায়। এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাঁধের বাইরে থাকা শতাধিক পরিবার ও কয়েকশ একর জমি। এ অবস্থায় নদী শাসনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
ইতোমধ্যে বলেশ্বর নদের তীরে সাউথখালী ইউনিয়নের বগী থেকে মোরেলগঞ্জ সীমানার সন্ন্যাসীর ফাসিয়াতলা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ৯ কিলোমিটার মূল বাঁধসহ সিসি ব্লক ধসে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন ভয়াবহ ভাঙন দেখে শরণখোলাবাসীর আক্ষেপ, সিডরের ১৭ বছর পর এসেও বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে। আতঙ্কে দিন কাটছে বলেশ্বর নদের তীরের বাসিন্দাদের।
নদ তীরবর্তী গাবতলা গ্রামের বাসিন্দা মিজান হাওলাদার, দক্ষিণ সাউথখালী গ্রামের আলমগীর হোসেন, জাহাঙ্গীর খান, উত্তর সাউথখালী গ্রামের আনোয়ার হাওলাদার বলেন, টেকসই বেড়িবাঁধ ছিলো না বলে সিডরে আমরা স্বজন হারিয়েছি। ঘর-বাড়ি সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে একটি টেকসই ও উঁচু বেড়িবাঁধ চেয়েছিলাম। উঁচু বাঁধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা টেকসই হয়নি। নদী শাসন না করে বাঁধ নির্মাণ করায় বছর না যেতেই ভাঙন শুরু হয়েছে। দ্রুত নদী শাসনের ব্যবস্থা করা না হলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই বাঁধ ভেঙে বিলিন হতে পারে।
ভাঙন কবলিত সাউথখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, নদী শাসন ছাড়া টেকসই বাঁধ হওয়া সম্ভব নয়। তৎকালীন সরকার ও বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাঁধ নির্মাণে নদী শাসনের ব্যবস্থা না রেখে অদূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এখানে। মাটির বদলে নদীর বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এতে শুধু বাঁধ উঁচুই হয়েছে, কিন্তু টেকসই হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাগেরহাট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল বিরুনি বলেন, সিডরের পর সাউথখালী গাবতলার মানুষের দাবি ছিল ত্রাণ চাই না, টেকসই বাঁধ চাই। সেদিক বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ৬৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। যার ১২ কিলোমিটার ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ। নির্মাণ শেষে গত বছর ডিসেম্বরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাধটি বুঝে নেয়। তখনই বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বলেশ্বর নদীর ভাঙনের মুখে এখন নদীর ব্যাংক লাইন বাঁধের কাছে চলে আসছে। ভাঙনে ব্লক এলোমেলো হয়ে গেছে। নদী শাসন না করার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ২ কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বেড়িবাঁধ নিয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata
